মুক্তিযোদ্ধকে জানো
Youtube link
ব্রিটিশের বাংলা দখলের প্রেক্ষাপট
ব্রিটিশের বাংলা দখলের প্রেক্ষাপটটি তৈরী হয়েছিল বহু বছর পূর্বেই ।বাংলায়
উৎপাদিত পণ্য ইউরোপে বাজার লাভ করেছিল ইউরোপীয়রা এদেশে আসার
বহু শতক বছর পূর্বেই । এই পণ্য বানিজ্যে করায়ত্ব করতে ব্রিটিনের রাণী
এলিজাবেথ 1600 সালের 23 সেপ্টম্বর ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ভারতবর্ষে
বাণিজ্যের অধিকার দিয়ে সনদ প্রদান করেন । ইংল্যান্ডর রাণী কর্তৃক বাণিজ্য
সনদ পাওয়ার অর্থ ছিল তৎকালীন ব্রিটেনের সাম্রাজ্যবাদী লিপ্সা বাস্তবায়নের
সনদ । অবশ্য দীর্ঘ বছর ব্রিটিশরা তাদের এই লিপ্সার কথা প্রকাশ না করে শুধু
বাণিজ্যের দোহাই দিয়েছে ।
বাণিজ্য সনদ পাওয়ার পর ইষ্ট ইন্ডিয়া কম্পানী 1613 সালে সুরাটে
প্রথম বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে । এসময় মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসন
আমল ছিল । 1633 সালে তারা বাংলায় বানিজ্যের সূচনা করে এবং 1651
সালে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী বাংলায় বিনা শুল্কে বানিজ্যের অধিকার পায় এবং
হুগলীতে প্রথম বানিজ্য কুঠি স্থাপন করে। বাংলায় ইংরেজ উপনিবেশ স্থাপনের
প্রথম পদক্ষেপ ছিল এটি । বানিজ্য কুঠিতে রাখা হতো ইংরেজ সৈন্য । মোগল
সম্রাটগণ বাংলা শাসনের জন্য সুবেদার নিয়োগ করলেও ইংরেজদের
এমনভাবে বানিজ্য করার অধিকার দেন, যাতে তারা সৈন্য সামন্ত নিয়ে এ
দেশে ব্যবসা বানিজ্য করতে পারে ।
1707 সালে সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুগলশাহী দূর্বল হয়ে
পড়লে ইংরেজরা সে দূর্বলতার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে । বাংলার শক্তিশালী
সুবেদার মুর্শিদ কুলি খাঁকে পাশ কাটিয়ে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী মুগল
শাসকদের কাছ থেকে এমন সুবিধা আদায় করে নেয়,যা সার্বভৌমত্ব
লংঘনের শামিল ।দিল্লির দূর্বল শাসকরা সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে এ
কাজটি করেছিলেন । দেশী বেনিয়া মুৎসুদ্দীরা তাদের বানিজ্যের স্বার্থে ইষ্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানীর পক্ষে অবস্থান নিতে থাকে ।
1752 সালে আলীবর্দী খাঁর উত্তরাধিকার মনোনিত হওয়ার পর নবাব
সিরাজ-উদ্দৌলাহ ইংরেজদের কাজ কারবার খুব কাছ থেকে দেখার সুগোগ
পান । তিনি ইংরেজদের আচরণ লক্ষ্য করে ক্ষুব্ধ ছিলেন তখন থেকেই ।
1756 সালে বাংলার মসনদে বসেই নবাব সিরাজ-উদ্দৌলাহ ইংরেজদের
দমনে সংকল্পবন্ধ হন । মসনদে বসেই নবাব সিরাজ-উদ্দৌলার খালা
ঘসেটি বেগম এর ছেলে শওকত জং এর সাথে নবাব সিরাজ-উদ্দৌলার দ্বন্দ্ব ছিল ।
অন্য দিকে মুৎসুদ্দী বেনিয়ারা তাঁদের পূঁজির স্বার্থে নবাবের ইংরেজ বিরোধিতা
পছন্দ করছিল না । নবাব সিরাজ প্রথমে রাজনৈতিক ভাবে ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণ
করতে উদ্যোগী হন এবং ব্যর্থ হন । পরে সামরিকভাবে ইংরেজ দমনের পথ
বেছে নেন ।
ইংরেজরাও বসে ছিল না । তারা বেনিয়া শ্রেণীর প্রতিনিধি জগৎ শেঠ,
রায়দূর্লভ, মির্জা আমির বেগ, খাদেম হোসেন খান প্রমুখ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের
সাথে আলোচনার পর চুক্তিবদ্ধ হন । চুক্তিতে নবাব সিরাজকে সরিয়ে তার
প্রধান সেনাপতি মীর জাফরকে ক্ষমতায় বসানোর কথা হয় । বিনিময়ে মীর
জাফর ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর স্বার্থ রক্ষা করবে স্থির হয় । নবাব সিরাজ-
উদ্দৌলাহ মীর জাফরকে যে চিনতেন না তা নয় । এজন্য যুদ্ধের পূর্বে তিনি
প্রধান সেনাপতির পদ থেকে মীর জাফরকে সরিয়ে মীর মদনকে সে পদে
নিয়োগ দেন এবং সমরশালার প্রধান পদ থেকে রায়দূর্লভকে সরিয়ে নিয়োগ
দেন মোহন লালকে ।নবাব সিরাজ উদ্দৌলাহ আক্রমণের সূচনা করেন 1756 সালের 3রা জুন কাসিম বাজার কুঠি, 16 জুন কোলকাতা আক্রমণ করে এবং 20 জুন তা দখল করে নেন । কিন্তু নৌ শক্তির অভাবে হুগলি নদীর মোহনায় অবস্থানরত ইংরেজ বাহিনীকে আক্রমণ করতে ব্যর্থ হন এবং বেনিয়া মানিক চাঁদকে কোলকাতার দায়িত্ব দিয়ে নবাব সিরাজ উদ্দৌলাহ মুর্শিদাবাদে চলে যান ।
বলা বাহুল্য, বেনিয়া মানিক চাঁদের কারণেই ইংরেজরা কোলকাতা ও হুগলি জয় করতে পেরেছিল ।
ভারতের পূর্বাপর ঘটনা সাক্ষ দেয়, তাহলো স্থলযুদ্ধে নবাব বাহিনীর সাথে ইংরেজ বাহিনী কখনও পেরে ওঠেনি । তাদের প্রাধান্য ছিল জলযুদ্ধে । সব জেনে শুনে ক্লাইভ একটি ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে স্থলযোদ্ধে এলেন একটি বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে । যুদ্ধের প্রহসন শুরু হয় 23 জুন সকাল আট টায় । নবাব সিরাজ উদ্দৌলাহ মীর জাফরকে প্রাধান সেনাপতি পূনঃনিয়োগ দিয়ে বেনিয়াদের প্রতি আবেদন নিবেদন করে ও শেষ রক্ষা করতে পারেনি । বিকেল চার টায় এ বিশাল বাহিনী দাঁড়িয়ে থেকে পরাজয় বরণ করে । নবাব সিরাজের অনুগত কিছু সৈন্য যুদ্ধের এক পর্যায়ে ইংরেজ বাহিনীকে পরাজিত করার পর্যায়ে পৌঁছালে মীর জাফর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাদের থামিয়ে দেন । এভাবে বাংলার সামন্ত প্রতিনিধি নবাব সিরাজ-বেনিয়া মুৎসুদ্দী বণিক শ্রেণীর প্রতিভূ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পরাজিত হয়ে বাংলার মসনদ হারান ।
Comments
Post a Comment